রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত উক্তি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত উক্তি :


১৮৬১ সালের ৭ই মে বাংলা সাহিত্যের দিকপাল বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্ম গ্রহণ করেন।গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন তিনি। বিখ্যাত এই ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর,গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও দার্শনিক সালের   ৭ই আগস্ট মিত্যুবরণ করেন। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত উক্তি :
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গুরুত্বপূর্ণ যত উক্তি :
১) পৃথিবীর চারি দিকে দেয়াল , সৌন্দর্য্য তাহার বাতায়ন ।পৃথিবীর আর সকলই তাহাদের নিজ নিজ দেহ লইয়া আমাদের চোখের সম্মুখে আড়াল করিয়া দাঁড়ায় , সৌন্দর্য্য তাহা করে না —সৌন্দর্য্যের ভিতর দিয়া আমরা অনন্ত রঙ্গভূমি দেখিতে পাই । ( মর্ত্যের বাতায়ন)

২) জ্ঞানে প্রেমে অনেক প্রভেদ । জ্ঞানে আমাদের ক্ষমতা বাড়ে , প্রেমে আমাদের অধিকার বাড়ে । জ্ঞান শরীরের মত , প্রেম মনের মত । জ্ঞান কুস্তি করিয়া জয়ী হয় , প্রেম সৌন্দর্য্যের দ্বারা জয়ী হয় । জ্ঞানের দ্বারা জানা যায় মাত্র , প্রেমের দ্বারা পাওয়া যায় । জ্ঞানেতেই বৃদ্ধ করিয়া দেয় , প্রেমেতেই যৌবন জিয়াইয়া রাখে । জ্ঞানের অধিকার যাহার উপরে তাহা চঞ্চল , প্রেমের অধিকার যাহার উপরে তাহা ধ্রুব । জ্ঞানীর সুখ আত্মগৌরব-নামক ক্ষমতার সুখ , প্রেমিকের সুখ আত্মবিসর্জ্জন-নামক স্বাধীনতার সুখ । (জ্ঞান ও প্রেম)

৩) মনুষ্যত্বের মূলে আর একটি প্রকাণ্ড দ্বন্দ্ব আছে ; তাকে বলা যেতে পারে প্রকৃতি এবং আত্মার দ্বন্দ্ব । স্বার্থের দিক এবং পরমার্থের দিক , বন্ধনের দিক এবং মুক্তির দিক , সীমার দিক এবং অনন্তের দিক– এই দুইকে মিলিয়ে চলতে হবে মানুষকে ।

৪) মানুষের বিশ্বজয়ের এই একটা পালা বস্তুজগতে; ভাবের জগতে তার আছে আর-একটা পালা । ব্যাবহারিক বিজ্ঞানে একদিকে তার জয়স্তম্ভ, আর-একদিকে শিল্পে সাহিত্যে । (সাহিত্যের তাৎপর্য)

৫) প্রেমের দ্বারা চেতনা যে পূর্ণশক্তি লাভ করে সেই পূর্ণতার দ্বারাই সে সীমার মধ্যে অসীমকে, রূপের মধ্যে অপরূপকে দেখতে পায়— তাকে নূতন কোথাও যেতে হয় না । 

৬) ভক্তের দাসত্বে স্বাধীনতা আছে , ভক্তের স্বাধীন দাসত্ব তেমনি প্রকৃত — প্রণয় স্বাধীন প্রণয়। (আদর্শ প্রেম)

৭) ফুল যে কেবল বনের মধ্যেই কাজ করছে তা নয়—মানুষের মনের মধ্যেও তার যেটুকু কাজ তা সে বরাবর করে আসছে ।

৮) প্রেম যাহা দান করে , সেই দান যতই কঠিন হয়, ততই তাহার সার্থকতার আনন্দ নিবিড় হয় । ”
—- মনুষ্যত্ব

৯) স্বার্থ আমাদের যে-সব প্রয়াসের দিকে ঠেলে নিয়ে যায় তার মূল প্রেরণা দেখি জীবপ্রকৃতিতে; যা আমাদের ত্যাগের দিকে , তপস্যার দিকে নিয়ে যায় তাকেই বলি মনুষ্যত্ব , মানুষের ধর্ম । (মানুষের ধর্ম)

১০) মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে , মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই । এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে জীবন্ত হৃদয় – মাঝে যদি স্থান পাই ।

১১) যাহাকে তুমি ভালোবাস তাহাকে ফুল দাও , কাঁটা দিও না ; তোমার হৃদয়-সরোবরের পদ্ম দাও , পঙ্ক দিও না। ( মনের বাগানবাড়ি -১) 

১২) প্রেমের ধর্ম এই , সে ছোটোকেও বড়ো করিয়া লয়। আর , আড়ম্বর-প্রিয়তা বড়োকেও ছোটো করিয়া দেখে । এই নিমিত্ত প্রেমের হাতে কাজের আর অন্ত নাই , কিন্তু আড়ম্বরের হাতে কাজ থাকে না । প্রেম শিশুকেও অগ্রাহ্য করে না, বার্ধক্যকে উপেক্ষা করে না , আয়তন মাপিয়া সমাদরের মাত্রা স্থির করে না । ( হাতে কলমে) 

১৩) ভালোবাসা অর্থে আত্মসমর্পণ করা নহে , ভালোবাসা অর্থে ভাল বাসা , অর্থাৎ অন্যকে ভালো বাসস্থান দেওয়া, অন্যকে মনের সর্ব্বাপেক্ষা ভালো জায়গায় স্থাপন করা । (মনের বাগানবাড়ি -২)

১৪) মানুষের দেবতা মানুষের মনের মানুষ , জ্ঞানে কর্মে ভাবে যে পরিমাণে সত্য হই সেই পরিমাণেই সেই মনের মানুষকে পাই –অন্তরে বিকার ঘটলে সেই আমার আপন মনের মানুষকে মনের মধ্যে দেখতে পাই নে । মানুষের যত-কিছু দুর্গতি আছে সেই আপন মনের মানুষকে হারিয়ে, তাকে বাইরের উপকরণে খুঁজতে গিয়ে , অর্থাৎ আপনাকেই পর করে দিয়েছে । ( মানুষের ধর্ম ১/১১

১৫) মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ , সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব । আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে । আর-একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে । মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপমান মনে করি ।( সভ্যতার সংকট)

১৬) স্ত্রী-পুরুষগত প্রেমের ন্যায় প্রবল শক্তি আর কিছু আছে কি না সন্দেহ । এই শক্তি ষোলো আনা মাত্রায় সমাজের কাজে লাগাইলে মানবসভ্যতা অনেকটা বল পায়। এই শক্তি হইতে বঞ্চিত করিলে সমাজের একটি প্রধান বল অপহরণ করা হয় ।

১৭) শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী
পুরুষ গড়েছে তোরে সৌন্দর্য সঞ্চারি
আপন অন্তর হতে বসি কবিগণ
সোনার উপমাসূত্রে বুনিছে বসন ।
সঁপিয়া তোমার ’পরে নূতন মহিমা
অমর করিছে শিল্পী তোমার প্রতিমা ।(মানসী)

১৮) প্রেম শান্তিরূপেও আসবে অশান্তিরূপেও আসবে, সুখ হয়েও আসবে দুঃখ হয়েও আসবে–সে যে-কোনো বেশেই আসুক তার মুখের দিকে চেয়ে যেন বলতে পারি তোমাকে চিনেছি , বন্ধু তোমাকে চিনেছি ।

১৯) সোনার চেয়ে আনন্দের দাম বেশি ; ….. প্রতাপের মধ্যে পূর্ণতা নেই , প্রেমের মধ্যেই পূর্ণতা । সেখানে মানুষকে দাস করে রাখবার প্রকাণ্ড আয়োজনে মানুষ নিজেকেই নিজে বন্দী করেছে । (পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি)

২০) তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে ,
তা ব’লে ভাবনা করা চলবে না ।
ও তোর আশালতা পড়বে ছিঁড়ে ,
হয়তো রে ফল ফলবে না ।
আসবে পথে আঁধার নেমে , তাই ব’লেই কি রইবি থেমে–
ও তুই বারে বারে জ্বালবি বাতি ,
হয়তো বাতি জ্বলবে না ।

২১) আগুনকে যে ভয় করে সে আগুনকে ব্যবহার করতে পারে না । 

২২) রমণীর প্রেমের মধ্যে পরিতৃপ্তি আছে , বিশ্বাস আছে , নিষ্ঠা আছে , কিন্তু পুরুষের প্রেমের মধ্যে যে একটি চির অতৃপ্তিপূর্ণ অনির্বচনীয় সুখ আছে তাহা বোধ করি খুব অল্প রমণী উপভোগ করিয়াছে ।

২৩) পৃথিবীতে সকলের চেয়ে বড়ো জিনিস আমরা যাহা কিছু পাই তাহা বিনামূল্যেই পাইয়া থাকি , তাহার জন্য দরদস্তুর করিতে হয় না । মূল্য চুকাইতে হয় না বলিয়াই জিনিসটা যে কত বড়ো তাহা আমরা সম্পূর্ণ বুঝিতেই পারি না। 

২৪) সহজ মানুষের সত্যটি সামাজিক মানুষের কুয়াশায় ঢেকে রেখে দেয় । অর্থাৎ আমরা নানা অবান্তর তথ্যের অস্বচ্ছতার মধ্যে বাস করি । শিশুর জীবনের যে সত্য তার সঙ্গে অবান্তরের মিশেল নেই । তাই, তার দিকে যখন চেয়ে দেখবার অবকাশ পাই তখন প্রাণলীলার প্রত্যক্ষ স্বরূপটি দেখি ; তাতে সংস্কারভারে পীড়িত চিন্তাক্লিষ্ট মন গভীর তৃপ্তি পায় ।( পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি)।

২৫) সুন্দর আপনি সুন্দর এবং অন্যকে সুন্দর করে । কারণ,সৌন্দর্য্য হৃদয়ে প্রেম জাগ্রত করিয়া দেয় এবং প্রেমই মানুষকে সুন্দর করিয়া তোলে ।(সৌন্দর্য্য ও প্রেম)।

২৬) কবিদিগকে আর কিছুই করিতে হইবে না , তাঁহারা কেবল সৌন্দর্য্য ফুটাইতে থাকুন —জগতের সর্ব্ত্র যে সৌন্দর্য্য আছে তাহা তাঁহাদের হৃদয়ের আলোকে পরিস্ফুট ও উজ্জ্বল হইয়া আমাদের চোখে পড়িতে থাকুক , তবেই আমাদের প্রেম জাগিয়া উঠিবে, প্রেম বিশ্বব্যাপী হইয়া পড়িবে । ( কবিতা ও তত্ত্ব)।

২৭) ছেলে যদি মানুষ করিতে চাই , তবে ছেলেবেলা হইতেই তাহাকে মানুষ করিতে আরম্ভ করিতে হইবে , নতুবা সে ছেলেই থাকিবে , মানুষ হইবে না । শিশুকাল হইতেই কেবল স্মরণশক্তির উপর সমস্ত ভর না দিয়া সঙ্গে সঙ্গে যথা পরিমাণে চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তির স্বাধীন পরিচালনার অবসর দিতে হইবে ।
(শিক্ষার হেরফের)।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ